বুধবার, ৪ঠা আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

NewsFile Institute
Home / Big Picture Stories  / রাজা রামমোহন রায়ের দর্শন আজো মানুষকে অনুপ্রাণিত করে

রাজা রামমোহন রায়ের দর্শন আজো মানুষকে অনুপ্রাণিত করে

নারী স্বাধীনতা ও নারীমুক্তি আন্দোলনের পথ প্রদর্শক ছিলেন রামমোহন রায়।

আশুতোষ দাস

ভারতের সমাজ জীবনে যাঁর দর্শন আজো প্রাসঙ্গিক তিনি হচ্ছেন রাজা রামমোহন রায়। তিনি কুসংস্কার মুক্ত ভারত গড়তে চেয়েছিলেন, বাস্তব অর্থে তা কি হয়েছে ? কারণ আজো ভারতীয় সমাজ জীবন থেকে ডাইনী শব্দ মুছে যায়নি। কুসংস্কারের বশবর্তী হয়ে নানা জায়গায় ডাইনী ভেবে অসহায়, হতদরিদ্র মহিলাকে হত্যা করা হচ্ছে। বিশ্বায়নের যুগে পৌঁছেও পণপ্রথার নামে নারী নির্যাতন এখনো হচ্ছে। বাল্যবিবাহ বন্ধ হয়নি।
নারী স্বাধীনতা ও নারীমুক্তি আন্দোলনের পথ প্রদর্শক ছিলেন রামমোহন রায়। তাই স্বাভাবিকভাবে ইতিহাসের প্রেক্ষিতে রাজা রামমোহন রায়ের কথা বারবার উঠে আসছে। উনবিংশ শতাব্দীতে যে আন্দোলন সূচনা করছিলেন কুসংস্কার মুক্ত ভারত গড়ার তা আজো বাস্তবায়িত হয়নি। তার স্মরনীয় বিভিন্ন দৃঢ় পদক্ষেপের জন্য আমাদের শ্রদ্ধায় মাথা নত করতে হয়। বিশেষত সতীদাহ প্রথা বন্ধ, ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা ও হিন্দুসমাজে নানা কুসংস্কারের লড়াই এবং গ্রন্থ রচনার ভেতর দিয়ে তিনি আজও সমাদৃত। অতি সংক্ষিপ্তভাবে তাঁর জীবন নিয়ে আলোকপাত করা যাক। বাবার নাম রামকান্ত রায় আর মায়ের নাম তারিনীদেবী। তিনি ছিলেন তাঁর বাবার দ্বিতীয় পক্ষের কনিষ্ঠ পুত্র। তার জন্ম হুগলি জেলার রাধানগর গ্রামে, ১৭৭২এর ২২ মে আর
মৃত্যু হয় ২৭ সেপ্টেম্বর, ১৮৩৩ ইংরেজিতে। উল্লেখ্য, তার মায়ের দিকের সবাই ছিলেন ঘোর তান্ত্রিক, সেই অনুসারে মাতাও ছিলেন তান্ত্রিক। তারা ছিলেন দুই ভাই। ছোটবেলাতেই রামমোহনের অসাধারণ মেধা দেখতে পেয়ে বাবা তাকে বেনারসে সংস্কৃত পড়তে পাঠান, সেসময়ে বাবার সঙ্গে হিন্দু শাস্ত্র এবং আচার নিয়ে মতানৈক্য হতে থাকে বারবার। হিন্দুদের গোড়াপন্থীদের সঙ্গে তর্ক বিতর্কেও জড়িয়ে পড়েন তিনি। পিতা অতিষ্ঠ হয়ে তাকে ত্যাজ্য পুত্র করতে বাধ্য হন। কিন্তু আর্দশ ও যুক্তিতে সুদৃঢ় অবিচল ছিলেন রামমোহন। পরবর্তী সময়ে পাটনা থেকে আরবি, পার্সি, হিব্রু ও গ্রিক ভাষায়ও পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন তিনি । ভারতীয় নতুন চিন্তা মননের পথিক সমাজ সংস্কারক রামমোহন, পূর্বতর সমস্ত ধ্যান ধারনা ভেঙে ১৮২৯ সনে একেশ্বরবাদ প্রচারের উদ্দেশে ব্রাহ্ম সমাজ তৈরি করেন। বেদান্ত ছিল তার ধর্মের ভিত্তি ও মূলকথা। মানুষের সার্বিক কল্যাণ ও বিকাশ তার জীবন দর্শন ছিল। এই ভাবনায় তিনি মৃত্যুর আগে পর্যন্ত লড়ে গেছেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ বেদান্ত ভাষ্য, বেদান্তসার, ইত্যাদি। তিনি সতীদাহ প্রথার ঘোর বিরোধী ছিলেন। তার বড়ো ভাইয়ের মৃত্যু এবং বৌদিকে টেনে টেনে জীবন্ত অগ্নিতে ফেলে দেওয়ার ঘটনার দৃশ্য তাকে সতীদাহ প্রথা রোধ করার আন্দোলনের জন্য কঠোর ও সুূূদৃঢ় করেছিলো। বৃটিশ সরকার সতীদাহ প্রথা রোধ আইন প্রণয়ন তারই যুক্তিযুক্ত প্রস্তাবেই হয়েছিলো। ১৮২৯ সনের ৪ ডিসেম্বর রাজা রামমোহন রায়ের আবেদনের ভিত্তিতে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে লর্ড বেন্টিকের উদ্যোগে সতীদাহ প্রথা সম্পূর্ণ বাতিল বলে বৃটিশ সরকার ঘোষনা করে। রাজা রামমোহন রায় বাল্যবিবাহ বন্ধ, স্ত্রী শিক্ষার বিস্তার ইত্যাদি নানা কাজের আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন। পরবর্তীকালে বিদ্যাসাগর এই আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যান। বিভিন্ন ভাষায় গ্রন্থ লিখে তার যুক্তিনির্ভর কথাকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার আর্দশে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রাহ্ম সমাজে চলে আসেন এবং ১৮৩৩ সনের ২৭ সেপ্টম্বর রামমোহনের মৃত্যু হলে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসেন এবং আদি ব্রাহ্মসমাজ নামে আখ্যায়িত করেন। তার চিন্তা ও মনন আর্দশের ভিত্তিতে আজকের ভারতীয় আধুনিক সমাজ গড়ে উঠেছে। তবে তার ভাবাদর্শে আজো ভেদভাব হীন, জাতপাতহীন, কুসংস্কার মুক্ত স্বপ্নের ভারত গড়ে উঠেনি।