শনিবার, ২৪শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

NewsFile Institute
Home / Top Stories  / ইন্টারভিউ

ইন্টারভিউ

একপ্রকার আকুলতা নিয়ে দুম করে জিজ্ঞেস করে বসল - আচ্ছা, আপনিই তো বলতে পারবেন, চাকরিটা আমার হবে কি না? অন্যদের ইন্টারভিউ নিশ্চয়ই খুব ভালো হয়েছে!

………………. বিজয়া দেব

নাম তার সুনয়না। তাই বলে সে খুব চমৎকার দুটি নয়নের অধিকারী নয়। অতি সাধারণ দুটি চোখ। কথায় আছে “নামে কিবা এসে যায়”। নাম একটা আইডেন্টিটি, এর বেশি কিছু নয়। সুনয়না দেখতেও তেমন আহামরি নয়, তবে দীর্ঘাঙ্গী আর চমৎকার সুছাঁদে সে চুল বাঁধে। বয়স এখন তার ছাব্বিশ পেরিয়ে সাতাশে পড়েছে। বাড়িতে তার বিয়ের তোড়জোড় চলছে। তবে সুনয়না এতে খুব চিন্তিত। নিজের পায়ে দাঁড়ানোটা খুব জরুরী মেয়েদের জন্যে, এটা সে বোঝে। বিয়ের পর অনেকসময় অদ্ভুত সব জটিলতার শিকার হয়ে থাকে অনেক মেয়েরা, তাই সুনয়না একটা চাকরি খুঁজছে হন্যে হয়ে। বিয়ের পর কোনও সমস্যা তৈরি হলে অন্তত বেঁচে থাকার বন্দোবস্ত অবশ্যই করা দরকার বিয়ের আগেই এটা সে জোরালো ভাবেই বিশ্বাস করে। পড়াশুনোয় তার মান ছিল সাধারণ, কোনরকমে গ্রাজুয়েশন। তাই ছোটখাটো প্রাইভেট সংস্থায় সে আবেদন করেছে এবং হালে একটি নামী ব্র্যান্ডের ঘড়ি কোম্পানি থেকে সেলসগার্ল পোস্টের কল লেটার এসেছে ইন্টারভিউয়ের জন্যে।
ইন্টারভিউতে যখন সে উপস্থিত হলো দেখল জনা দশেক প্রার্থী। এরমধ্যে বেশিরভাগই স্মার্ট ও ইংরেজিতে পারদর্শী। ভেতর থেকে দমে গেলেও মনে জোর আনার চেষ্টা করে যায় সে। মনের জোরটাকে জাগিয়ে রাখতেই হবে, পিছিয়ে গেলে চলবে না একেবারেই, এভাবেই নিজেকে বোঝাল সে। ইন্টারভিউতে সে মুখোমুখি হলো একজন মধ্যবয়স্ক গুরুগম্ভীর ব্যক্তি, এক স্মার্ট তরুণী ও এক সাদামাটা বছর তিরিশের যুবকের সাথে। ইন্টারভিউ হলো ভালো মন্দ মিশিয়ে একপ্রকার। তরুণী ও মধ্যবয়স্ক প্রশ্ন করে গেল, সাদামাটা যুবক কোনও প্রশ্নই করে নি, খুঁটিয়ে দেখছিল তাকে, ব্যাপারটা খানিকটা অস্বস্তিকর লাগছিল।
চাকরি হবে অথবা হবে না এসব দোলাচল তার ভেতরে ছিল। কারণ এসব স্মার্ট যুবতীদের মধ্যে সে অনেকটাই পিছিয়ে পড়া। তবু একটু আশার আলো সে জোর করেই নিজের ভেতর জ্বালিয়ে রাখল। বাড়ি ফিরতেই মা একবার শুধু জিজ্ঞেস করল ইন্টারভিউ কেমন হয়েছে, তারপরই বলল – কাল তোকে দেখতে আসছে। এতদিন বিয়ের কথাবার্তা চলছিল শুধু। একটা চাপা ভয় তার ভেতরে ছিল পাত্রপক্ষ তাকে দেখতে আসবে। এই সমাজ এখনও অনেকগুলো মধ্যযুগীয় প্রথা লালন করে চলেছে, তারমধ্যে এটি একটি। শিক্ষিত মানুষেরা কেন এসব প্রথাকে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে না এটা একটা অতি সঙ্গত প্রশ্ন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে এর কোনও উত্তর নেই। ঘোর অপছন্দের হলেও সে আগামীকালের ব্যাপারে কোনও উচ্চবাচ্য করল না, কারণ চাকরি সে আদৌ পাবে কি না জানে না তাই ‘ অপছন্দ’ ‘ঝুঁকি’ ইত্যাদি শব্দের সাথে তাকে সহাবস্থান করতেই হবে। মা বললেন, তোকে ম্যাজেন্টা রঙের শাড়িতে খুব মানায়, বিকেলে বেরিয়ে ঐ রঙের একটা ভালো শাড়ি কিনে নিয়ে আয়। সুনয়নার বাবা একটা সাধারণ মানের সরকারি চাকুরি করেন। চাকুরি থেকে অবসরের আগে মেয়েকে পাত্রস্থ করতে পারলে তিনি বেঁচে যান। মার কথা সমর্থন করে বাবাও বললেন, শাড়ি ভালো দেখে কিনিস, কত দেব বল্ তো, বলে মানিব্যাগে হাত রাখেন। একবারও জিজ্ঞেস করলেন না যে তার ইন্টারভিউ কেমন হয়েছে ? আসলে বাবা আগে থেকেই ধরে নিয়েছেন চাকুরি করা তার হবে না, আজকাল সাধারণ গ্রাজুয়েশন দিয়ে কিছু হয় না।
একটা ম্যাজেন্টা রঙের শাড়ি পাওয়া গেল। বেশ ভালোই দেখতে, দামটা একটু বেশি। বাবা প্রায় মুক্তহস্তেই শাড়ি কেনার জন্য টাকা দিয়েছেন। শাড়ি কিনে বাইরে এসে দেখল হাওয়া বইছে, আকাশে কালো মেঘেরা ডানা বিস্তার করছে। বৃষ্টি আসবে হয়ত।
বাসস্ট্যান্ডে এসে দাঁড়িয়েছে সে, সাথে ছাতা নেই, ফাল্গুনের শেষ, ঝোড়ো হাওয়া যে উঠবে বুঝতে পারে নি, আবহাওয়া একটু গরম ছিল।
বাসে যাবেন?
চমকে তাকাল সুনয়না, সেই সাদামাটা যুবকটি, আজ যে ইন্টারভিউ বোর্ডে ছিল।
আপনি? আপনিই তো আজ ইন্টারভিউ বোর্ডে ছিলেন না?
যুবকটি মৃদু হাসল। সুনয়না ভুলেই গেল যুবকটি তার অপরিচিত। একপ্রকার আকুলতা নিয়ে দুম করে জিজ্ঞেস করে বসল – আচ্ছা, আপনিই তো বলতে পারবেন, চাকরিটা আমার হবে কি না? অন্যদের ইন্টারভিউ নিশ্চয়ই খুব ভালো হয়েছে!
যুবকটি স্মিতমুখে তাকিয়ে। একটু পর্যবেক্ষণের ভঙ্গি। ইন্টারভিউতে তাকে এমনি পর্যবেক্ষণ করছিল। ব্যাপারখানা কি? এইবার যেন স্থান কাল পাত্র ব্যাপারে সচেতন হলো সে। বলল – স্যরি। কিছু মনে করবেন না। এভাবে আমার জিজ্ঞেস করা ঠিক নয়। স্যরি এগেইন।
যুবকটি বলে – ও ঠিক আছে। জিজ্ঞেস করতেই পারেন। ইন্টারভিউ দেওয়ার পর একটা চিন্তা তো থেকেই যায়। বৃষ্টি পড়ল বলে। আপনি আমার সাথে আসতে পারেন। গাড়ি রয়েছে, বাড়ি যাবেন নিশ্চয়ই, পৌঁছে দেওয়া যাবে।
গাড়ি রয়েছে? হ্যাঁ, ঐতো ঐপাশে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। তবে লোকটি কি তাকে দেখে গাড়ি থামিয়ে নেমে এলো! খুব আশ্চর্য তো! না কি লোকটির এদিকে কোনও কাজ ছিল? কথাটা ভাবতে ভাবতেই বাস এসে পড়েছে দেখে সুনয়না হেসে বলল – আমার বাস এসে গেছে, অনেক ধন্যবাদ। যুবকটি হেসে বলল – আচ্ছা, আসুন।
বৃষ্টি এলো বাড়ি ফেরার পর। মা খুব তোড়জোড় করছে। আগামীকাল রবিবার, পাত্রপক্ষ সকাল ন’টা নাগাদ আসবে। খুব আনমনা লাগছে সুনয়নাকে। সুনয়নার বাবা ও মা দুজনেই লক্ষ্য করলেন মেয়েটা খুব অন্যমনস্ক, একবারের জন্যে জিজ্ঞেস করল না আগামীকাল যারা আসছে তাদের কথা, পাত্র কী করে কোথায় থাকে ইত্যাদি সাধারণ প্রশ্নগুলোর ব্যাপারে মেয়েটার কোনও আগ্রহ নেই যেন।
আর এদিকে সুনয়না একটা ঘোরের মাঝে রয়েছে, ঈস, ঐ যুবকটির নাম জানা হলো না, ওর সাথে এলে তো ভালোই হতো, কী ভাবল কে জানে, ইন্টারভিউ বোর্ডে ছিল, ওর ফোন নং টা পেলে… সবতাতেই নিজের বড্ড বাড়াবাড়ি, চাকরি পাওয়ার একটা সুযোগ হয়তো হাতের কাছে এসেছিল, সে সেটা নিতে পারল না। আর হয়তো কখনওই দেখা হবে না। আচ্ছা, যুবকটি গাড়ি থামিয়ে নেমে এলো কেন, কত প্রার্থী রয়েছে, তাদের মাঝে সে সবচাইতে সাধারণ। রাতে ঠিকঠাক ঘুম হলো না সুনয়নার। চাকরির খুব দরকার তার এটা যুবকটিকে বুঝিয়ে বলা যেত যদি তার দেওয়া লিফট্ টা সে নিত। গাড়িতে একসাথে এলে কথায় কথায় তার দরকারের কথাটা বলা যেত। কী সুযোগটাই না সে হারাল।
পরদিন সকালে মা তাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলল। রাতে ঘুম প্রায় হয়নি। সকাল আটটা বেজে গেছে। মা কতসব বলে চলেছে, এত দেরি কেন, ওরা এসে যাবে এই দশটা নাগাদ, সুনয়নার কিচ্ছু ভালো লাগছে না। কাকতালীয়ভাবে যুবকটি এসেছিল, চাকরিটা সে পেতে পারতো, নিজের নির্বুদ্ধিতায় আজ, কাল, পরশু এইভাবে হয়ত আরও অনেকটা সিটিং তাকে দিতে হবে তথাকথিত পাত্রপক্ষের সামনে, নিজের জীবনটা নিজের কাছে ধীরে ধীরে অতিষ্ঠ হয়ে উঠবে। কিছুই করার নেই। বিমর্ষ মন নিয়ে প্রাত্যহিক কাজটুকু সারার পর তার নিজের অভ্যেস অনুযায়ী সুছাঁদে চুল বাঁধল, ম্যাজেন্টা রঙের নতুন শাড়িটি চমৎকার করে পরল, মুখের সাজটি নিত্যদিনের মত সাদামাটা-ই রাখল, কারণ নিজের নামের মত নিজের চেহারাটাও তার আইডেন্টিটি, ওর ওপর মুখোশ চড়ানো ঠিক হবে না।
অতঃপর প্রতীক্ষার অবসান, পাত্রপক্ষ এলো। ছোট্ট নোটবুকে আজ থেকে নোট নেবে সুনয়না। আজকে তারিখ বার লিখে নিয়ে লিখল “সুনয়নার জীবনে বহুপ্রতীক্ষিত প্রথম নেতিবাচক মোড় – পাত্রপক্ষ নং – ১।”
বাবা এসে ঢুকল। বলল – এখন আবার কী লিখছিস? আয়, চলে আয়। ওরা অপেক্ষা করছে। যন্ত্রের মত সুনয়না যাচ্ছে বাবার পিছু পিছু, সুনয়না ঘরে পা দিল। কারো দিকে না তাকিয়ে সে বসে আছে যেন পাথরের মূর্তি। মা বলল – প্রণাম কর সু। – এক মহিলার কণ্ঠ তার কানে এলো – না না প্রণাম করতে হবে না। নমস্কারটাই ভালো। কী সুন্দর নামে ওকে ডাকেন আপনারা -” সু”। এবার তাকাল সে। খুব মা মা চেহারার এক মহিলা, চেহারায় আলাদা প্রশান্তি আছে। এবার পুরুষকণ্ঠ কানে এলো – গতকাল বৃষ্টিতে ভিজেছেন? – ভীষণ চমকে তাকিয়ে সে দেখল সেই সাদামাটা যুবকটি। মহিলাটি বললেন – তোমাদের আগের পরিচয় আছে? বলে পরিচয় করিয়ে বললেন – এই আমার ছেলে, মা। বলে সেই নামী ব্র্যান্ডের ঘড়ির কোম্পানির নাম করে বললেন-ছেলে আমার ঐ কোম্পানির সেলস ম্যানেজার।- যুবকটি হেসে বলে – গতকাল উনি আমাদের কোম্পানিতে ইন্টারভিউ দিয়েছেন। আজ আবার… গতকাল বিকেলে হয়তো ভেবেছেন আমাদের আর কখনও দেখা হবে না? – যুবকটি সাদামাটা দেখতে হলেও একেবারেই আড়ষ্টতা নেই, বড্ড সাবলীল। হতভম্ব সুনয়না তাকিয়ে রইল অপলক, সাদামাটা ও সাবলীল যুবকটির দিকে, স্থান কাল পাত্র ভুলে।


সমাপ্ত।