বৃহস্পতিবার, ৫ই আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

NewsFile Institute
Home / Big Picture Stories  / গ্রাম – শহরের আত্মকথা

গ্রাম – শহরের আত্মকথা

ছোট শহরে বিকেলে, সন্ধ্যায় মোড়ে মোড়ে চায়ের আড্ডায় কতো বন্ধু সহপাঠীদের সঙ্গে সময় কাটানোর যে আনন্দ তা বড় শহরের লোকজন বুঝতে পারে না। তাই বলে কি এখানে মানব সন্মেলন নেই, নিশ্চয়ই আছে, সপ্তাহের শেষে পার্টি

ডঃ তাপসী গুপ্ত

ছোট শহরের মন বড়, প্রাণ চঞ্চল, হৃদ্যতায় ভরপুর আর বড় শহরের বড় ব্যাপার – মন উদাস, প্রাণ নিখোঁজ আর হৃদ্যতাও সীমিত। গ্রামগঞ্জ ও ছোট শহরই সমস্ত উৎসবকে জীবিত রেখেছে, বড় শহরে উৎসব নীরবে নিভৃতে আসা যাওয়া করে। নানা ভাষা, নানা জাতি নানা মোর পরিধান… নানা উৎসবকে গুরুত্ব দেওয়ার সময় কোথায়? নিজেকে যে সে কবেই বিকাশের পথে বিলিয়ে দিয়েছে। তার তো পিছুটান থাকার কথা নয়। আধুনিক বিজ্ঞানের অবদান অনস্বীকার্য। বড় শহরের লোকজন অতি আধুনিক, শিক্ষিত, ইন্টারনেটে পারদর্শী, এরা অনেক কিছু জানে, ইন্টারনেটে অনেক নুতন নুতন আবিষ্কৃত পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারে তাতে অনতিবিলম্বে খাবার, বাজার ঘরে চলে আসে, সময়ের অপব্যয় হয় না। সময় বাঁচিয়ে সময়ের কি যে ব্যবহার হয় তাই বোঝা যায় না। চোখে দেখে, হাতে ছুঁয়ে, দাম দর করে বাজার করার মাঝে যে আনন্দ তা উপলব্ধি করার সময় কোথায়। ছোট শহরে বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠরা বাজার করে সময়োপযোগী রান্না হয়, বড় শহরে এসবের বালাই নেই। বেশিরভাগ সময়ই খাবার বাইরে থেকে আসে। গৃহে পরিবেশনের খুব সুন্দর ব্যবস্থা। শহরে বড় বড় এপার্টমেন্ট আর এই এপার্টমেন্ট শব্দটি সত্যি সবাইকে এপার্টই করে দিলো। ইট পাথরের তৈরি শহর তো মনে হয় যুবাদের দৌড় প্রতিযোগিতার স্থান আর বয়োজ্যেষ্ঠরা নির্বাক দর্শক। করোনা তো তবু ওদের ঘরে থাকায় বাধ্য করিয়েছে হয়তো কিছু সময়ের জন্য নতুবা ঘর তো শুধু ওদের রাত কাটাবার জন্যই ছিল।
ছোট শহরে বিকেলে, সন্ধ্যায় মোড়ে মোড়ে চায়ের আড্ডায় কতো বন্ধু সহপাঠীদের সঙ্গে সময় কাটানোর যে আনন্দ তা বড় শহরের লোকজন বুঝতে পারে না। তাই বলে কি এখানে মানব সন্মেলন নেই, নিশ্চয়ই আছে, সপ্তাহের শেষে পার্টি হয়, জলপান, সুরাপান হয়, শুধু কে যে কাকে কি বলে আর কে যে কি বোঝে তাই বোঝা যায় না। সবই হয় শুধু প্রানের বিনিময় হয় না। শব্দ আর সময়ের কি ব্যবহার হয় তাও বোঝা যায় না।
এখানে ঋতু আসে ঋতু যায় তফাৎ কি সে তায়। ঋতু পরিবর্তন তো ছোট শহরে লক্ষনীয়। বারো মাসে তেরো পার্বণ, কাল বৈশাখী ঝড়, বসন্তে কোকিলের কুহু কুহু গান, ফাল্গুনের দোল উৎসব, গ্রীষ্মের পাকা আম-কাঁঠালের গন্ধ, বর্ষায় মেঘ গুরু গুরু ডাক্, আঁকা বাঁকা পথে হাঁটু ছোঁয়া জল, “গ্রাম ছাড়া ওই রাঙা মাটির পথ মন ভোলায়”…. মনে পড়ায়।
ছোট বেলায় পড়েছিলাম প্রতিবেশী প্রথম ও পরম আত্মীয়, গ্রামে গঞ্জে এখনোও প্রতিবেশী একে অপরের সুখ দুঃখে ঝাঁপিয়ে পড়ে কিন্তু শহরে প্রতিবেশীর সংজ্ঞাই পাল্টে গেছে, কিছু লিখিত বা অলিখিত নিষেধাজ্ঞা বা নিয়ম আছে কিনা জানিনা নাকি সময়ের না মানসিকতার অভাবে বাক্য বিনিময় তো দুরের কথা অতি অল্প সময়ের বা বিনে খরচায় হাসিটুকু বিনিময় করতেও দ্বিধা। সবাই যেন কেমন গুরু গম্ভীর, গভীর তত্বে মগ্ন। শহরকে যেন মরুভূমির মতো বোধহয় প্রানহীন ধূ ধূ বালুকাময়। ছোট বেলায় মা বলতেন ‘ গল্প না করলে তোদের ভাত হজম হয় না’ এ কথাটি সত্যি খুব উপলব্ধি করতাম, বন্ধু বান্ধবীদের সাথে দিনে অন্তত একবার চুটিয়ে গল্প না করলে মন ভালো লাগতো না, শুধু একটু প্রান খুলে হাসার জন্য আর কিছু প্রান খুলে গল্প করতে এক পাড়া থেকে আর এক পাড়ায় চলে যেতাম আর এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা মোবাইলের পর্দায় বাঁচার রসদ খুঁজে বেড়াচ্ছে, প্রানের রসদের সন্ধানই পেলো না।মা বাবা দিন রাত ছেলে মেয়েদের সাথে ইংরেজি ভাষায় কথা বলে চলেছে কারণ ইংরেজি ভাষায় চোস্ত হতে হবে মাতৃভাষার কবে যে মৃত্যু হলো ভগবান জানে। আবেগের আদান-প্রদান বিদেশি ভাষায় কতোটুকু হয় কে জানে।
গ্রামে বা ছোট শহরে এখনও শিশু ও বৃদ্ধরা সমাদৃত। শিশুদের খেলার মাঠ আর বয়োজ্যেষ্ঠদের সমবেত হবার মঠ, মন্দির, মসজিদ আছে বা প্রতিবেশী বাড়ির নানা অনুষ্ঠানে যোগদানের সুবিধা আছে আর বড়ো শহরে শিশু আর বয়োজ্যেষ্ঠদের অবস্থা খুবই সঙ্গীন। খাঁচার পাখি, সীমিত তাদের গতিবিধি, সীমিত তাদের জীবন ধারা। মানুষের মন বড় বিচিত্র আমরা গ্রামে শহর খুঁজি আর শহরে গ্রাম খুঁজে বেড়াই।