বৃহস্পতিবার, ৫ই আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

NewsFile Institute
Home / Big Picture Stories  / শ্যামসুন্দর পালিওয়াল : দুর্ভিক্ষের হাত থেকে পিপ্লান্ত্রি গ্রামকে রক্ষা করেন

শ্যামসুন্দর পালিওয়াল : দুর্ভিক্ষের হাত থেকে পিপ্লান্ত্রি গ্রামকে রক্ষা করেন

ধ্বংসের হাত থেকে গ্রামটিকে বাঁচানোর জন্য তিনি প্রথমে তার মৃত মেয়ের প্রেমের স্মৃতিতে একটি গাছ লাগালেন এবং গ্রামের সরপঞ্চ হওয়ার পরে তিনি আইন প্রণয়ন করলেন যে, গ্রামে কোন মেয়ে শিশুর জন্ম হলে প্রত্যেক পরিবারকে ১১১

অনুরণ ভট্টাচার্য

সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম শ্যামসুন্দর পালিওয়াল, যিনি ‘ইকোফেমিনিজম অফ ফাদার ট্যাগ পেয়েছিলেন, তার জীবনের গল্পেই আমরা মেয়ে শিশুদের বিষ দিয়ে মেরে ফেল আবর্জনা ফেলে দেওয়ার বিষয়গুলো দেখতে পাই। আসল ঘটনা সূত্রপাত হয়েছিল জয়পুর অধ্যুষিত পিপ্লান্ত্রি নামক গ্রামের দুর্ভিক্ষ ও অনাহারের ঘটনা থেকে। শ্যামসুন্দর রাজস্থানের পিপ্লান্ত্রি গ্রামের একজন সমাজকর্মী । ৯ জুলাই ১৯৬৪ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেই তিনি আর পড়াশোনা করতে পারেননি। পরবর্তী জীবনে তিনি একটি মার্বেল কোম্পানিতে কর্মরত হন। পিপ্লান্ত্রী তে ছিল প্রচুর পরিমাণে মার্ভেল পাথরের খনি। যার জন্য এখানে নানা উদ্যোগ ও শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে থাকে, যার ফলে প্রচুর পরিমাণে গাছ কাটা হয় ও সেখানকার জল ও বিষাক্ত হতে থাকে। এটি ছিল ২০০৬ সাল, যখন শ্যামসুন্দর, পিপ্লান্ত্রি গ্রাম পঞ্চায়েতের গ্রাম প্রধান হিসাবে কাজ করছিলেন। অতিরিক্ত খনন,জল ও উদ্ভিদের ঘাটতিতে গ্রামে খরার সমস্যা দেখা দেয়। জলই জীবন ও জীবনের আঁধার,প্রকৃতি যখন দুরবস্থায় জর্জরিত হয়, তখন মহামারী ও দুর্ভিক্ষের মত পরিস্থিতিতে ত্রাহিমাম-ত্রাহিমাম শুরু হয়ে যায়। পালিওয়ালের দুর্ভাগ্য তখন দরজায় কড়া নাড়ছিল, এই দুর্ভিক্ষে জল শূন্যতার কারণে সে তার নিজের মেয়ে কিরণকে মৃত্যুর মুখে ঢলে যেতে দেখেছে। সে দেখেছে গ্রামে জন্ম নেওয়া অনেক মেয়ে শিশুদের বিষ খাইয়ে মেরে আবর্জনা ফেলে দিতে।

    শ্যামসুন্দর পালিওয়াল অনুভব করতে পারছিলেন যে, তার গ্রাম ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে এগোচ্ছে। তাই এই ধ্বংসের হাত থেকে গ্রামটিকে বাঁচানোর জন্য তিনি প্রথমে তার মৃত মেয়ের প্রেমের স্মৃতিতে একটি গাছ লাগালেন এবং গ্রামের সরপঞ্চ হওয়ার পরে তিনি আইন প্রণয়ন করলেন যে, গ্রামে কোন মেয়ে শিশুর জন্ম হলে প্রত্যেক পরিবারকে ১১১ টি গাছ রোপণ করতে হবে এবং পরিবারের মানুষ ও গ্রামবাসী মিলে প্রত্যেকটি কন্যা সন্তানের নামে ৩১ হাজার টাকা করে ফিক্স ডিপোজিটে ১৮ বছরের জন্য রাখতে হবে। এই পরিকল্পনা গ্রামটিকে আমূল পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যায়। গ্রামের মেয়ে শিশুর মৃত্যুর হার কমতে থাকে। কয়েক বছরের মধ্যেই গ্রামটির শ্যামলী আবার ফিরে আসে,ধীরে ধীরে মাটি উর্বর হয়ে উঠে। উল্লেখ্য যে,তিনি এবং তাঁর গ্রামবাসী মিলে অ্যালোভেরা ও গোলাপের চাষ শুরু করেন, যাতে করে পণ্য সামগ্রী হিসেবে সেগুলো কে ব্যবহার করে গ্রামবাসীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায়। 

জল সংরক্ষণ ও যোগাযোগের উদ্দেশ্যে তিনি ‘স্বজলধারা যোজনা’ শুরু করেন ও গ্রামে প্রায় ১৮০০টি বাঁধ নির্মাণ করেন। তাছাড়াও গ্রামে “ওপেন মলত্যাগ মুক্ত ভারত”প্রকল্পের প্রচার করেন।শ্যামসুন্দর থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ভারত ২০০১ সালে মেয়ে শিশুকে বাঁচানোর জন্য একটি নীতিও চালু করেছিল ।তার এই মহৎ কাজের জন্য সরকার তাকে ‘করমবীর চক্রে’ ভূষিত করেন। উল্লেখ্য যে পিপ্লান্ত্রি গ্রামে তার প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে অনুপ্রাণিত হয় ডেনমার্ককেও এখন তারই শিক্ষা ব্যবস্থার অনুকরণ করা হচ্ছে। পালিওয়াল এর এই উদ্যমী প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানিয়ে বলিউড ও হলিউড দুটোতেই দুটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়। তার এই উদ্যমী প্রচেষ্টা গুলোকে যদি বিশ্বের সব জায়গায় মেনে নেওয়া যায়, তাহলে পুরো বিশ্ব আবার প্রাণ ফিরে পেতে পারে। আজ এই শ্যামসুন্দর পালিওয়াল বিশ্বের সকল দেশের লোকের কাছে অনুপ্রেরণা স্বরূপ।